আমি মারা গেলে আমার মরদেহ এই বাংলাদেশের পূণ্যভূমিতে পাঠাতে হবে: ফাদার মারিনো রিগন

Oct. 22, 2017, 10:55 p.m. তাঁর কথা


বলছিলাম একজন মুক্তিযোদ্ধা, সমাজ সংস্কারক আর আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু ফাদার মারিনো রিগনের কথা

তির্থক আহসান রুবেল:

বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট ইতালীয় অনুবাদক, সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী ও মুক্তিযোদ্ধা ফাদার মারিনো রিগন (৯২) আর নেই। শুক্রবার রাত ১০টার দিকে ইতালির ভিচেঞ্চায় মৃত্যু হয় রিগনের। ফাদার রিগনের বাংলাদেশ ঘিরে ত্যাগ, অবদান এবং ভালবাসার কথাগুলো ২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর ব্লগে প্রকাশ করেছিলাম।

১৯২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী ইতালির ভেনিসের ভিল্লাভেরলা গ্রামে জন্ম নেয় শিশুটি। ১৯৫৩ সালের ৭ জানুয়ারী ২৮ বছর বয়সে কলকাতা থেকে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে যখন বাংলাদেশের মায়াময় এই সবুজ প্রান্তরে পা রাখেন তখনও হয়ত ভাবতে পারেন নি, একদিন তিনি ভাই-বোনদের চাপে হৃদরোগের অসুস্থতার চিকিৎসা করাতে ইতালি যাবার পূর্বে তাদের শর্ত্ব দেবেন: “অপারেশনে আমি মারা গেলে আমার মরদেহ এই বাংলাদেশের পূণ্যভূমিতে পাঠাতে হবে।”এদেশ ও দেশের মানুষকে ভালবেসে আজ প্রায় ৫৯ বছর তিনি সেবা দিয়ে যাচ্ছেন বাংলার জনপদের মানুষদের। একজন ধর্মযাজক হিসেবে এদেশে যতটা না ধর্ম প্রচার করেছেন, তারচেয়েও অনেক বেশী করেছেন সমাজ সংস্কার। শতভাগ সংস্কৃতিসেবী ও একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। যার কলমে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ, পল্লীকবি জসীমউদ্দিন আর মনের মানুষ লালন শাহ পৌঁছে গেছেন সূদুর ইতালীতে। কারণ তাঁর ইতালীয় অনুবাদে ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয় গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ এবং পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথের আরো প্রায় ৪০টি কাব্যগ্রন্থ, কবি জসীমউদ্দিনের নকশীকাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট ছাড়াও এদেশের নামী অনেক কবির কবিতা আর লালন শাহ’র প্রায় ৩শ ৫০টি গান ছুঁয়ে গেছে ইতালীর সাহিত্য-সংস্কৃতিপ্রেমীদের হৃদয়। ১৯৯০ সালে তাঁর ভাইবোন আর বন্ধুদের উদ্যোগে ইতালীতে প্রতিষ্ঠিত হয় রবীন্দ্র অধ্যায়নকেন্দ্র। আর এই অধ্যায়ন কেন্দ্রের উদ্যোগে ইতালীর একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে, রবীন্দ্র সরণি। এই কেন্দ্রটি প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে আয়োজন করে রবীন্দ্র উৎসব। বলছিলাম একজন মুক্তিযোদ্ধা, সমাজ সংস্কারক আর আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু ফাদার মারিনো রিগনের কথা। সূদুর ইতালিতে জন্ম নেয়া এই মানুষটি তাঁর কর্মের মাধ্যমে হয়ে উঠেছেন খাঁটি বঙ্গ প্রেমিক।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের দারিদ্র পীড়িত মানুষদের ফাদার রিগন দেখান বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন। মংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল শেলাবুনিয়ায় সেলাই কেন্দ্র পূনঃচালুর মাধ্যমে শত শত নারীকে দিয়েছেন জীবনে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার মন্ত্র। তাঁর তত্বাবধানে এই নারীদের সূচশিল্পের সৃষ্টি নকশীকাথার চারটি প্রদর্শনী হয়েছে ইতালীর বিভিন্ন শহরে। ফাদার রিগনের উদ্যোগে বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পীরা ইতালীতে পরিবেশন করেন নকশীকাঁথার মাঠ অবলম্বনে গীতিনৃত্য। এছাড়াও এ দেশের সাংস্কৃতিক শিল্পীরা বহুবার সফর করেছে ইতালির নানা আয়োজনে । যা ইতালীতে পৌছে দিয়েছে আমাদের সংস্কৃতির সৌরভ ।

এদেশ গঠনে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান শিক্ষাক্ষেত্রে। তিনি ১৯৫৪ সালে মংলায় প্রতিষ্ঠিত করেন স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেন্ট পল্স উচ্চ বিদ্যালয়। উনার সরাসরি হস্তক্ষেপে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রায় সবগুলোতেই পাওয়া যাবে তাঁর ব্যক্তিগত স্পন্সরশীপে পড়াশোনা করা বহু শিক্ষার্থীকে। আর দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পাওয়া যাবে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। শিক্ষার পাশাপাশি দেশজ সংস্কৃতির বিকাশে তিনি গড়েছেন নানা রকম সাংস্কৃতিক দল। যেমন গম্ভীরা ও যাত্রার দল। সেই সাথে দেশীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য, গান। আরও গড়েছেন অডিটোরিয়াম। স্বাস্থ্য সেবার জন্য বন্ধ থাকা চিকিৎসা কেন্দ্রটিকে দিয়েছেন নবপ্রাণ।

বানিয়ারচরের জমিগুলোতে ঝিল হওয়ায় কোন ফসল হতো না। সেখানকার অধিবাসীরা অভাব আর দারিদ্রের মাঝে এক প্রকার না খেয়ে মারা যেতে লাগলো। তখন ফাদার রিগন তাদের পাশে দাঁড়ালেন। সবাই মিলে স্বেচ্ছাশ্রমের বিনিময়ে শত শত একর জমিতে ফিরিয়ে আনলেন উর্বরতা। গ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তিনি নিজে মাঠে কাজ করেছেন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে নিয়ে। বানিয়ারচরে গড়েছেন প্রায় ৩০টি ইরি ব্লক। লাঙ্গলের জায়গায় এনে দিলেন ট্রাক্টর। একদিন যারা না খেয়ে মারা যাচ্ছিল, সেসব পরিবারের সন্তানেরা আজ এমএ বিএ পাশ করে ঢাকার বুকে চাকরী করছে। সেখানকার মাছ চাষীদের তিনি তৈরি করে দেন ফিসিং বোট আর লঞ্চ। ফলে তারা বিল থেকে ধরা মাছ বিক্রি করতে লাগলো খুলনায়। এলাকায় হলো অর্থনৈতিক উন্নতি।

একজন অসা¤প্রদায়ীক ফাদার রিগন সরাসরিই বলেন, “একজন লোক না খেয়ে মারা যাচ্ছেন, আপনি তাকে খাবার দিবেন নাকি ধর্মের ভাল ভাল কথা শোনাবেন? কোনটা তখন জরুরী?” তিনি আরো বলেন, “আমি অনেক মা বাবাকে সন্তান হবার পর জিজ্ঞেস করেছি, বাচ্চা বড় হলে কি করবেন? তারা বলেছে মানুষ করবো। কেউ কিন্তু বলেনি, আমি আমার সন্তানকে মুসলমান বানাবো, হিন্দু বানাবো বা বৌদ্ধ খ্রিষ্টান বানাবো”। আর তাই তো তিনি মানবহিতৌষী কাজে কখনই খুঁজেন নি সেখানকার মানুষ খ্রিষ্টান না হিন্দু না মুসলমান। তিনি সাদা চোখে দেখেছেন অনেক মানুষের মুখ। খুঁজেছেন অনেক মানুষের মুখের হাসি। ফিরিয়ে দিতে চেয়েছেন তাদের জীবনের বেঁচে থাকার স্বপ্ন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় ফাদার ছিলেন গোপালগঞ্জের বানিয়ারচরের মিশনারিতে। পাক সেনারা গাণহত্যা শুরু করলে সে সময় অনেক লোক প্রাণভয়ে বরিশাল ও খুলনার অনেক লোক এখানে আশ্রয় গ্রহণ করে। সেদিন এই চার্চে কোন হিন্দু, মুসলমান কিংবা খ্রিষ্টান যাচাই বাছাই হয়নি। সব ধর্মের সবাই এখানে নিরাপদ আশ্রয় পান। ফাদার সবাইকে বলতেন তোমরা এখানে নিরাপদে থাকবে তোমাদের পালাতে হবে না। পাকিস্তানীরা তোমাদের কোন ক্ষতি করতে চাইলে আগে আমাকে গুলি করে মারতে হবে, তারপর তোমাদের কাছে যাবে। যদিও স্থানীয় খ্রিষ্টানরা হিন্দুদের আশ্রয় দিতে ভয় পাচ্ছিল। কারণ পাকে সেনারা হিন্দুদের প্রতি অনেক বেশী আক্রোশ দেখাতো। তাই অনেক খ্রিষ্টান প্রথম দিকে হিন্দুদের আশ্রয় দিতে চাইছিল না। তখন ফাদার এক প্রার্থনাসভায় সবার উদ্দেশ্যে বলেন, “তোমরা কেউ যিশুর সন্তান নয়। তা যদি হতে তবে এমন গর্হিত কাজ তোমরা করতে পারতে না। যিশু তার চরম শত্র“কেও পরম বন্ধুর মতো আশ্রয় দিত বিপদে। আর তোমরা তোমাদের ভাই-বোনদের বিপদে ঘরের দরজা বন্ধ রেখেছো। তোমাদের পবিত্র কাজ হচ্ছে বিপদগ্রস্থ এই নির্দোস মানুষদের জীবন রক্ষা করা।” ফাদারের এই বক্তব্যের পর তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে এবং প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই আশ্রয় হয় পালিয়ে আসা মানুষের। চরের নৌ পথের দিকে ফাদার সব সময় তাঁর বাইনোকুলার দিয়ে চোখ রাখতেন। তিনি সবাইকে জানিয়ে রেখেছিলেন, যদি পাক সেনারা আসে তবে আমি গির্জার ঘন্টা বাজাবো। আর তা শোনার সাথে সাথে তোমরা সবাই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাবে।

যুদ্ধ চলাকালিন সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস বাড়াতে নৌকা বানিয়ে তাতে বাংলাদেশের পতাকা লাগিয়ে নদের জলে ভাসিয়ে দিতেন। তিনি সেখানকার সব মৎসজীবির নৌকাতেও লাগিয়ে দিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলার পতাকা। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ১ম পর্যায়ে একটি নৌকার নাম দিয়েছিলেন “সংগ্রামী বাংলা”। যখন গণহত্যার দৃশ্য তিনি দেখতে পান, তখন একটি নৌকার নাম দেন “রক্তাক্ত বাংলা”। আর স্বাধীনতার পর তিনি দুটো নৌকা বানিয়ে তাদের নাম দেন “স্বাধীন বাংলা” এবং “মুক্ত বাংলা” ।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বৃহৎ বেসামরিক বাহিনীর একটি ছিল হেমায়েত বাহিনী (৫,৫৫৮জন মুক্তিযোদ্ধার বাহিনী)। হেমায়েত বাহিনীর প্রধান হেমায়েত উদ্দীন (পরবর্তীতে বীর বিক্রম) রামশীল গ্রামে পাক বাহিনীর সাথে তুমুল যুদ্ধের মুখোমুখি হন। এই যুদ্ধে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর মকবুল মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। তাঁর লাশ সরাতে গিয়ে হেমায়েতের মুখের একপাশ দিয়ে গুলি ঢুকে অপর পাশের চোয়ালের নিচ দিয়ে গুলি বেরিয়ে যায়। যাবার আগে ফেলে দিয়ে যায় হেমায়েতের মুখের ১১টি দাঁত। এক টুকরো জিহবাও পড়ে যায়। এই যুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা ছিল ১৫৮। হেমায়েত তাঁর বাহিনীতে থাকা চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিয়েও কয়েকদিনে মুখের ঘা শুকাতে পারছিলেন না। তখন তিনি দারস্থ হলেন ফাদার রিগনের। ফাদার রিগন তখন মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় গোপন একটি চিকিৎসা কেন্দ্র চালু করেন। যা কর্মময় হয়ে উঠতো রাতের অন্ধকারে। সেই চিকিৎসা কেন্দ্রে প্রায় তিনশতাধিক মুক্তিযোদ্ধার পাহারায় তিনদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন হেমায়েত। ফাদার রিগন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সে অপারেশন করান। সুস্থ্য হয়ে হেমায়েত আবার ফিরে যান নিজের বাহিনী নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে। স্বাধীন দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত বলেন, “ফাদার নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমার জন্য যা করলেন তার ঋণ কোনদিন্ও শোধ করা সম্ভব না। সে সময় উপরে ছিল আল্লাহ আর নীচে ফাদার রিগন।” ফাদার রিগন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন চাল, ডাল, টাকা। যুদ্ধপরবর্তীকালে অনেক বিধবা নারীকে পূণর্বাসিত হতে সহায়তা করেন তিনি।

আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্বারক চারটি নৌকা, আলোকচিত্র এবং যুদ্ধকালীন নিজের লেখা ডায়রী তিনি মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে জমা দিয়েছেন ২০০৬ সালে।

ফাদার মারিনো রিগন আবেগ আপ্লুত কন্ঠেই বলেন, যে দেশের মানুষ মাটির মায়ায় প্রাণ দেয় সে দেশ ছেড়ে আমি আর ফিরে যাইনি নিজের দেশ ইতালিতে। এদেশে তাঁর শিক্ষামূলক, সৃজনশীল, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও দেশপ্রেমের অনন্য দৃষ্টান্তের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দিন আহমেদ নাগরিকত্ব প্রদান পত্রে স্বাক্ষর দিয়ে ফাদার মারিনো রিগনকে দিয়েছেন এদেশের নাগরিকত্ব। তাই তো আজ আমরা গর্ব করে বলতে পারি, এদেশ যেসব কারণে পৃথিবীর সেরা দেশ তার একটি হচ্ছে ফাদার মারিনো রিগন এদেশের নাগরিক। কিন্তু একটা জায়গায় আমরা সব সময়ই পিছিয়ে। আর তা হচ্ছে মানুষের অবদানের সম্মাননাটুকু আমরা মরণের আগে দিতে ভুলে যাই খুব সহজেই । আমরা অপেক্ষা করি একটি মরোনত্তর পদক ধরিয়ে দিতে। আর তাই তো এদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা আর অসহায় মানুষের মাথা উঁচু জীবনযাত্রাকে মধ্যগগনের সূর্যের মতো বিকশিত করতে এত অবদান যার তাকে কেন আজো দিতে পারলাম না একুশে কিংবা স্বাধীনতা পদক? ফাদার নিজের মতোই সেবা ধর্ম আর প্রেম নিয়ে বেঁচে থাকবেন এদেশের লাখো কোটি মানুষের হৃদয়ে। রাজনীতি করার জন্য তাঁর জন্ম হয়নি। তাই বলে কি জাতি তার কৃতজ্ঞতা জানাবে না?

(এই লেখাটির মাধ্যমে ফাদার মারিনো রিগনের বাংলাদেশের কর্মময় জীবনের অতিক্ষুদ্র একটি অংশ প্রকাশ করার চেষ্টা হয়েছে মাত্র)

 

কারুনিউজ/২২অক্টোবর/টিএআর/এমআই