নবজাগরণের অন্যতম প্রাণপুরুষ প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ

July 4, 2017, 5:17 p.m. তাঁর কথা

ইব্রাহিম খাঁ একাধারে প্রবন্ধকার, নাট্যকার, গদ্য-লেখক, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ ও সমাজ-সংস্কারক হিসেবে সুপরিচিত

অধ্যাপক মতিউর রহমান : ইংরেজি শিক্ষা-সভ্যতা-সাহিত্যের প্রভাবে বাঙালি হিন্দু সমাজে ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নেই নবজাগরণের উন্মেষ ঘটে। বাঙালি মুসলিম সমাজে এ নবজাগরণের সূত্রপাত ঘটে এর প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল পরে। পলাশী যুদ্ধের পর ইংরেজদের বৈরি আচরণের ফলে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা-সভ্যতার প্রতি বিদ্বেষভাব ছিল। এ কারণে বাঙালি মুসলিম সমাজ ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রসর হয়েছে অনেক পরে। মূলত ১৮৫৭ সালে মহাবিদ্রোহ তথা সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থতা বরণের পর তারা নিরুপায় হয়ে ভাগ্যোন্নয়নের উদ্দেশ্যে ইংরেজি শিক্ষা লাভে অগ্রসর হয়। ১৮৬৩ সালে কলকাতায় মোহামেডান লিটার‌্যারি সোসাইটি’ গঠনের পর ধীরে ধীরে ভারতীয় মুসলমানগণ ইংরেজি শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হন। এরই ফলে বাঙালি মুসলিম সমাজে নবজাগরণ ঘটে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে। এ নবজাগরণের অন্যতম প্রাণপুরুষ প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ।
ইব্রাহিম খাঁ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি একাধারে প্রবন্ধকার, নাট্যকার, গদ্য-লেখক, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ ও সমাজ-সংস্কারক হিসেবে সুপরিচিত। ১৮৯৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইল জেলার বিরামদী গ্রামে তিনি এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শাহবাজ খাঁ এবং মাতার নাম রতন খানম। তিনি ১৯১২ সালে পিংনা হাইস্কুল থেকে এন্ট্রান্স, ১৯১৪ সালে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে এফএ ১৯১৬ সালে কলকাতা সেন্ট পলস কলেজ থেকে ইংরেজিতে বিএ অনার্স ও ১৯১৯ সালে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এমএ পাস করেন।
টাঙ্গাইলের করটিয়া ইংরেজি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯২০ সালে তিনি ভারতীয় কংগ্রেস পার্টিতে যোগদান করেন। অতঃপর তিনি অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে (১৯২০-২২) সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এ সময় তার চেষ্টায় করটিয়া ইংরেজি উচ্চবিদ্যালয় জাতীয় বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। ১৯২৪ সালে তিনি আইন পাস করে শিক্ষকতা পেশা পরিত্যাগ করে ময়মনসিংহ জজকোর্টে ওকালতি শুরু করেন।
ঐ সময় তিনি ময়মনসিংহে ‘আল হেলাল সাহিত্য সমিতি’ গঠন করে তরুণদের সাহিত্য চর্চায় উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস পান। উক্ত সাহিত্য সমিতি স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ইসলাম ধর্মবিষয়ক রচনা আহ্বান করত এবং প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে তিনটি ভালো রচনার জন্য পুরস্কার প্রদান করত। এর উদ্দেশ্য ছিল বাংলা সাহিত্যে ইসলামী ভাবধারার প্রবর্তন ও তরুণ সাহিত্যিক সৃষ্টিতে প্রেরণা দান। (দ্র. বিবিধ প্রসঙ্গ”, সাম্যবাদী’, ৩য় বর্ষ-২য় সংখ্যা, ফাল্গুন, ১৩৩১, পৃ. ৬)। প্রথম বছরের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। এ রচনা প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন তৎকালীন চট্টগ্রাম কলেজের মেধাবী ছাত্র মুহাম্মদ এনামুল হক (পরবর্তীতে ডক্টর) এবং রৌপ্যপদক পেয়েছিলেন হুগলী মাদরাসার ছাত্র মুহাম্মদ মনসুর ও ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী মোসাম্মৎ জোবেদা খাতুন। ১৯২৬ সালে করটিয়ার জমিদার দানবীর ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর অর্থ সাহায্যে করটিয়া সা’দত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। উক্ত কলেজে তিনি প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল নিযুক্ত হন। তৎকালীন যুক্ত বাংলা, বিহার ও ঊরিষ্যার মুসলমানদের মধ্যে তিনিই প্রথম এ পদ অলঙ্কৃত করেন। পরবর্তীতে উক্ত কলেজ তার অক্লান্ত চেষ্টা ও দক্ষ পরিচালনায় তদানীন্তন যুক্ত বাংলায় এক ঐতিহ্যবাহী নামকরা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এক সময় উক্ত কলেজ ‘বাংলার আলীগড়’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এ কারণে সমসাময়িককালে তার নামের সাথে ‘প্রিন্সিপাল’ শব্দটি অনিবার্যভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে। তিনি এ নামেই বিশেষভাবে পরিচিত হন। শিক্ষাব্রতী হিসেবে তার অবদান সম্পর্কে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক ডক্টর সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, “বাংলার উচ্চশিক্ষাব্রতী মুসলমান সমাজে তিনি ছিলেন এক অনুপ্রেরণাস্বরূপ। তার প্রেরণা ও উৎসাহে অন্ধকারের পর্দা ছিঁড়ে ফেলে শিক্ষার আলোতে ছুটে আসতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে একালের বহু মুসলমান। তাই তাদের চেতনায় প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ অমরত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। মুসলিম সমাজে সকলের আগে প্রিন্সিপাল হয়ে যে অসাধ্য তিনি সাধন করেছেন তার জন্য দেশবাসী ‘প্রিন্সিপাল’ শব্দটি অতিশ্রদ্ধাভরে তার নামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন।”
আজীবন শিক্ষাব্রতী হিসেবে প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ বাঙালি মুসলিম সমাজে শিক্ষার আলো জ্বালাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। অধঃপতিত মুসলিম জাতি তখন অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। শিক্ষা জাতির মেরুদ-। শিক্ষা ব্যতীত কোনো জাতির উন্নতি আশা করা যায় না। তাই ইব্রাহীম খাঁ নিজে উচ্চশিক্ষা লাভ করে আজীবন শিক্ষাদান কাজে নিরত থাকেন। পাঠ্য বই রচনা ও শিক্ষামূলক নানা প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও গ্রন্থাদি রচনা করেন। শিক্ষার উন্নয়নে তিনি অসংখ্য সভা-সেমিনারে যোগদান করেন। বিভিন্ন স্কুল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদান রাখেন। তার প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভূঞাপুর হাইস্কুল, ভূঞাপুর বালিকা বিদ্যালয়, ভূঞাপুর কলেজ, করটিয়া জুনিয়র গার্লস মাদরাসা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তার রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য ছিলÑ দেশ ও জাতির খেদমত করা। রাজনীতির মাধ্যমে তিনি সারা দেশে শিক্ষা বিস্তার, মুসলিম সমাজের কুসংস্কার দূরীকরণ ও জাতীয় উন্নয়নে তাদের উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াসে লিপ্ত ছিলেন। তার মতো নিঃস্বার্থ সমাজকর্মী ও জনকল্যাণকামী মহান ব্যক্তি আমাদের দেশে অতিশয় দুর্লভ।
ব্যক্তিগতভাবে ইব্রাহিম খাঁ ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম, অমায়িক, বিনয়ী ও সজ্জন ব্যক্তি। নিষ্ঠাবান মুসলিম হিসেবে মুসলিম সমাজের উন্নতিকল্পে সারা জীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করা সত্ত্বেও তিনি মনে-প্রাণে ছিলেন একজন উদার ব্যক্তি। ১৯৫০ সালে ঢাকায় ও ১৯৬৪ সালে টাঙ্গাইলে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সূত্রপাত হলে তিনি সর্বাগ্রে তা প্রতিরোধ করার জন্য সচেষ্ট হন। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে তার আচার-আচরণ ছিল অতিশয় উদার, অমায়িক ও মানবিক। এ প্রসঙ্গে তার একজন বিখ্যাত ছাত্র ‘জাদু সম্রাট’ পিসি রায়ের উক্তি স্মরণযোগ্য। তিনি গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তির সাথে তার শিক্ষক ইব্রাহীম খাঁকে ‘হৃদয় সম্রাট’ হিসাবে আখ্যায়িত করেন।
বহুবিধ কাজের মধ্যে ইব্রাহীম খাঁর প্রধান পরিচয় হলো লেখক হিসেবে। এক্ষেত্রেও তার অবদান বিচিত্র ও বিশাল। তিনি একাধারে প্রবন্ধ, নাটক, ছোটগল্প, উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনী, স্মৃতিকথা ও শিশুতোষ গ্রন্থ রচনা করেন। তার রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের তালিকা নিম্নরূপ :
নাটক : কামাল পাশা (১৩৩৪), আনোয়ার পাশা (১৩৩৭), ঋণ পরিশোধ (১৯৫৫), ভিস্তি বাদশা (১৯৫৭), কাফেলা।
উপন্যাস : বৌ বেগম (১৯৫৮)।
গল্পগ্রন্থ : আলু বোখরা (১৯৬০), উস্তাদ (১৯৬৭), দাদুর আসর (১৯৭১), মানুষ, হিরকহার।
স্মৃতিকথা : বাতায়ন (১৩৭৪)।
ভ্রমণ কাহিনী : ইস্তাম্বুল যাত্রীর পত্র (১৯৫৪), নয়া চীনে এক চক্কর, পাকিস্তানের পথে-ঘাটে।
শিশু সাহিত্য : ব্যাঘ্র মামা (১৯৫১), শিয়াল প-িত (১৯৫২), নিজাম ডাকাত (১৯৫০), বেদুঈনদের দেশে (১৯৫৬), ইতিহাসের আগের মানুষ (১৯৬১), গল্পে ফজলুল হক (১৯৭৭), ছোটদের মহানবী, ছেলেদের শাহনামা, ছোটদের নজরুল, গুলবাগিচা, নবী জীবনের ঝা-া বহিল যারা, তুর্কী উপকথা, নীল হরিণ, সোহরাব রোস্তম ইত্যাদি।
ধর্মবিষয়ক গ্রন্থ : মহানবী মুহাম্মদ, ইসলামের মর্মকথা, ইসলাম সোপান, ছোটদের মিলাদুন্নবী।
শিক্ষাবিষয়ক গ্রন্থ : আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, সংস্কৃতির মর্মকথা, নীতিকাহিনী।
ইব্রাহীম খাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা মোট ১১৮টি। এর মধ্যে ১৮টি অনুবাদ গ্রন্থ, ইংরেজিতে লেখা গ্রন্থের সংখ্যা ১২ এবং বাংলা ভাষায় রচিত মৌলিক গ্রন্থের সংখ্যা মোট ৮৮টি। ইংরেজিতে লেখা তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘এনেকডোটস ফ্রম ইসলাম’ একটি মূল্যবান গ্রন্থ। এটি পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
শিক্ষাবিদ, সমাজ-সংস্কারক, রাজনীতিবিদ ও লেখক ইব্রাহীম খাঁর একটি সাধারণ পরিচয় হলো তিনি ছিলেন মনে-প্রাণে একজন সমাজ-সচেতন, জনদরদী, মানবকল্যাণকামী ও সর্বোপরি অধঃপতিত মুসলিম সমাজের নবজাগরণে বিশ্বাসী এক মহৎ প্রাণের মানুষ। তার সাহিত্যে সর্বত্র এ বিশ্বাসের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। তার জীবনের লক্ষ্য ও আদর্শ থেকে তার লেখাকে স্বতন্ত্রভাবে বিচার করা সম্ভব নয়। তার সাহিত্যের ভাষা অতি সহজ, সরল ও সকল শ্রেণির মানুষের নিকট বোধগম্য। তার সাহিত্যের বিষয় ও বিভিন্ন চরিত্রও পরিচিত সমাজ ও পরিপার্শ্ব জগত থেকে সংগৃহীত। সব ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের চিত্র তিনি অতিশয় আন্তরিকতার সাথে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন। সমাজের বিভিন্ন সমস্যা ও অনাচার-কুসংস্কারের বিষয় তিনি তুলে ধরেছেন, মূলত সেগুলোর যুক্তিযুক্ত সমাধান বাতলে দেয়ার জন্য। অধঃপতিত-বঞ্চিত মুসলিম সমাজের উন্নতিকল্পে তিনি নবজাগরণের প্রেরণায় তাদের উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস পেয়েছেন। সাহিত্য-সাধনা তার নিকট কোনও পেশা বা নেশা ছিল না। মূলত সমাজের প্রতি অসীম দায়বদ্ধতা থেকে তিনি সাহিত্য চর্চায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে তার একটি উক্তি স্মরণযোগ্য। তার লেখা এক পত্রে তিনি বলেন, “আমার কর্মজীবনের এক বিশাল এক অংশ আমি সাহিত্য সেবায় যাপন করেছি। সাহিত্য সাধনা আমার বিলাস ছিল না, এ ছিল আমার জীবনের অন্যতম তপস্যা। এ তপস্যার মারফত আমি তন্দ্রাহত জাতিকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। আমার সে আহ্বানে সমাজের সকল মানুষের নিন্দ্রা ভঙ্গ হয়নি সত্য, তবে অনেকে মোচড় দিয়ে অর্ধজাগ্রত হয়েছে, আর কতক পূর্ণ জাগ্রত হয়ে উঠে বসেছে। আমার এই ক্ষুদ্র সাফল্যকে আমি আমার জীবনের অন্যতম সার্থকতা বলে মনে করি।....”
ইব্রাহীম খাঁর সাহিত্যের ভাষা সহজ-সরল ও সকলের বোধগম্য হওয়ার ব্যাপারে তার নিজস্ব একটি দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। ইংরেজ আমলে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ স্থাপিত (১৮০০) হওয়ার পর সংস্কৃতবহুল, দুর্বোধ্য এবং অলঙ্কারপূর্ণ ভাষায় অনেকে সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। এ ভাষা স্বল্পসংখ্যক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি ছাড়া সাধারণের জন্য ছিল অনেকটা দুর্বোধ্য। পরবর্তীতে ভাষাকে সহজিকরণ করার চেষ্টা চলে। ভাষার এ সহজিকরণ প্রক্রিয়ায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মোহাম্মদ নজিবর রহমান প্রমুখ বিশেষ সফলতা অর্জন করেন। বাংলা বানানের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময় নানা জটিলতা ও সমস্যার সৃষ্টি হয়। ইতঃপূর্বে সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুসরণে বাংলা ব্যাকরণ লেখার যে প্রচেষ্টা, তার ফলেই এ ধরনের জটিলতা ও সমস্যার সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার সাথে লেখ্য ভাষার দূরতিক্রম্য ব্যবধানের ফলেও এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলা বানান রীতি প্রবর্তনে বাংলা একাডেমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ ক্ষেত্রে ইব্রাহীম খাঁর দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত বাস্তবধর্মী। তিনি মনে করেন, সাহিত্য মানুষের জন্যÑ সাধারণ মানুষ যাতে সাহিত্য পাঠে আগ্রহী হয় এবং সহজে সাহিত্য রস আস্বাদন করতে সক্ষম হয়, সেদিকে দৃষ্টি রেখেই সাহিত্য রচিত হওয়া উচিত। এ সম্পর্কে তিনি ১৯৬৮ সনে সিরাজগঞ্জে অনুষ্ঠিত এক সাহিত্য সম্মেলনে বলেন, “একটি হরফ জ্ঞান নেই এমন লাখ লাখ লোক নয়, কোটি কোটি লোক বাংলার পুঁথিপুঞ্জ থেকে পেয়ে আসছে সাহিত্যের রস, চিত্তের আনন্দ, প্রাণের খোরাক। আমরা জনগণের সাহিত্য জনগণের জন্য ফিরিয়ে দিতে চাই, পুঁথি সাহিত্য চাই না, আমরা চাই সহজ-সুন্দর ভাষায় লিখিত জনগণের উপযোগী ভাষা। অকারণে হরফের জুলুম অকারণে বানানের জুলুম এ আমরা বরদাশত করতে চাই না।”
ইব্রাহীম খাঁর রচিত নাটক ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে লেখা। তার রচিত ‘কামাল পাশা’ ও ‘আনোয়ার পাশা’ নাটকে তুরস্কের নবজন্মের কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলার মুসলিম সমাজে নবজাগরণের প্রেরণা সৃষ্টি করাই তার মূল্য লক্ষ্য। তার রচিত ‘ঋণ পরিশোধ’, ‘ভিস্তি বাদশা’, ‘কাফেলা’ প্রভৃতি নাটক সামাজিক বিষয় নিয়ে লেখা। এসব নাটকে আমাদের সমাজে যে সব সমস্যা, অনাচার ও কুসংস্কার বিরাজমান তার বিষয় উল্লিখিত হয়েছে। লেখক সেসব সমস্যার সমাধানও বাতলে দিয়েছেন, সামাজিক অনাচার ও কুসংস্কার দূরীকরণার্থে তিনি নাটকের পাত্র-পাত্রীর সংলাপ, ঘটনা ও আখ্যানের বিন্যাস ঘটিয়েছেন। তার রচিত সামাজিক নাটকের বিষয়বস্তু, চরিত্র ইত্যাদি সবকিছুই চলমান সমাজ ও সাধারণ মানুষের জীবন থেকে সংগৃহীত। নাটকের বিভিন্ন ঘটনা, সংলাপ ও চরিত্রের বর্ণনায় লেখক অত্যন্ত সহজ-সরল, অনেক ক্ষেত্রে হাস্যতরল ও ব্যঙ্গাত্মক ভাষা ও ভঙ্গি ব্যবহার করেছেন।
 উপন্যাস ও গল্প রচনায় ইব্রাহিম খাঁ সমাজের বিভিন্ন বিষয় ও জীবনের বিচিত্র দিক তুলে ধরেছেন। এখানেও মূলত সমাজ-সেবা ও সমাজ-সংস্কারই তার প্রধান উদ্দেশ্য। তার গল্প-উপন্যাসের ভাষা সহজ-সরল ও রসঘন। তার গল্প বলার আয়েশী ভঙ্গি সকলকে মুগ্ধ করে। তাই সকল শ্রেণির পাঠকের নিকট তা সহজেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ছোটদের জন্যও তিনি বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। এগুলো অধিকাংশই পাঠ্য-পুস্তক হিসেবে রচিত। সেকালে লেখকের সংখ্যা ছিল কম, ভালো পাঠ্য-পুস্তকেরও নিদারুণ অভাব ছিল। বিশেষত শিশু-কিশোরদের ভালো ভালো কথা, উপদেশ ও শিক্ষার মাধ্যমে তাদের চরিত্র গঠন ও সাহসী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার  উদ্দেশ্যেই ইব্রাহীম খাঁ এ সকল গ্রন্থ রচনায় সচেষ্ট হন। শিশু-কিশোরদের উপযোগী গ্রন্থে শিশু-কিশোর মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে সহজ-সরল ভঙ্গিতে হাস্য-কৌতুকের মাধ্যমে তিনি অনায়াসে তাদের উপযোগী মনোগ্রাহী গ্রন্থ রচনা করেন। বাংলা শিশু-সাহিত্য শাখায় তার অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তার শিক্ষাবিষয়ক রচনায় শিক্ষাবিদ ইব্রাহীম খাঁর চিন্তা-চেতনা, আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থার গলদ ও তা নিরসনের উপায়-নিরূপণ সম্পর্কে তিনি মূল্যবান পরামর্শ দান করেছেন।
ইসলামবিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থে তিনি ইসলামের মূল আদর্শ ও শিক্ষা সম্পর্কে যুক্তিপূর্ণ আলোচনা পেশ করেছেন। শিক্ষিত সমাজকে বিশেষত তরুণদের ইসলামের প্রকৃত জ্ঞান দানের উদ্দেশ্যেই তিনি এসকল গ্রন্থ রচনা করেন।
ভ্রমণ কাহিনীমূলক রচনায় তিনি পৃথিবীর যে সব দেশ সফর করেছেন, তার অভিজ্ঞতার আলোকে সেসব দেশের ভৌগোলিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক নানা বিষয় রসঘন ও চিত্তাকর্ষকভাবে তুলে ধরেছেন। এসব গ্রন্থ পাঠে বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয় অবগত হওয়া যায়। তার স্মৃতিকথামূলক রচনা ‘বাতায়নে’ জীবনের ব্যাপক অভিজ্ঞতার অন্তরঙ্গ বর্ণনা স্থান পেয়েছে। এটি তার সমকালিন জীবনের এক অবিস্মরণীয় গুরুত্বপূর্ণ দলীল।
বাঙালি মুসলিম নবজাগরণের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্রান্তিলগ্নে ইব্রাহীম খাঁর আবির্ভাব। দীর্ঘকাল ইংরেজের পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ থেকে এবং একাধারে ইংরেজি ও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজের জুলুম-নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে বাঙালি মুসলমানগণ অধঃপতনের চরম পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধে অধঃপতিত ও আত্ম-সম্মিতহারা মুসলিম জাতির মধ্যে নবজাগরণের প্রেরণা সৃষ্টি হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে নবজাগরণের এ চেতনা তাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যপথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।
ইব্রাহীম খাঁ তার অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সময় নানা খেতাব ও পুরস্কার পেয়েছেন। বৃটিশ সরকার তাকে প্রথমে ‘খান সাহেব’ ও পরে ‘খান বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করে। খান সাহেব উপাধি তিনি সঙ্গে সঙ্গেই প্রত্যাখ্যান করেন এবং খান বাহাদুর খেতাব তিনি পরবর্তীতে বৃটিশ সরকারের মুসলিমবিরোধী মনোভাবের প্রতিবাদে প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান সরকার তাকে ‘তঘমা-এ-কায়দে আযম’ খেতাব প্রদান করেন। ১৯৭১ সালে পাক বাহিনীর নৃশংসতার প্রতিবাদে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি নাটকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ‘একুশে পদক’ লাভ করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি ভূঞাপুর ‘সাহিত্য সংসদ’ গঠন করে একুশে পদকের সব অর্থ ও কিছু জমি উক্ত সাহিত্য সংসদে দান করেন। মুসলিম নবজাগরণ, শিক্ষা-সাহিত্য ও সমাজকল্যাণে কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখে এ মহান ব্যক্তি ১৯৭৮ সালের ২৯ মার্চ ইন্তিকাল করেন।

 

 

 

blog comments powered by Disqus