বদলে যাচ্ছে চলচ্চিত্রে সরকারী অনুদানের নীতিমালা

Nov. 28, 2017, 6:29 p.m. বিনোদন


অনুদানের জন্য ছবি বাছাই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব, অনুদান পাওয়ার পর ছবি নির্মাণ না করে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখাসহ নানা কারণে এমনিতেই সরকারি অনুদান নিয়ে বিতর্ক বিদ্যমান।

চলচ্চিত্র শিল্পে মেধা ও সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করা এবং আবহমান সংস্কৃতি সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার প্রায় চার দশক ধরে অনুদান দিয়ে আসছে। ১৯৭৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সূর্য দীঘল বাড়িনির্মাণের মধ্য দিয়ে এ দেশে সরকারি অনুদানে ছবি নির্মাণ আরম্ভ হয়। এর পর থেকে অনুদানের অর্থে ছবি নির্মাণের সংখ্যা বাড়লেও এ নিয়ে ব্যর্থতার উদাহরণই বেশি। বিশেষ করে গত এক দশকে অনুদানের জন্য অর্থ বরাদ্দ যে মাত্রায় বেড়েছে, সে হারে গুণগত ছবি নির্মাণের সংখ্যা বাড়েনি। উল্টো ছবি নির্মাণ না করে এ অর্থ নির্মাতা/প্রযোজকদের কেউ কেউ তাদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় উন্নত মানের চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি অনুদান প্রদান নীতিমালা-২০১২ (সংশোধিত)-এ বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। তথ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র ও চলচ্চিত্র অনুদান কমিটির কয়েকজন সদস্য বিষয়টি টকিজকে নিশ্চিত করেছেন। তাদের বক্তব্য: অনুদান নীতিমালার সংশোধনী নিয়ে এ মুহূর্তে কাজ চলছে, অচিরেই তা প্রস্তাবনা আকারে উত্থাপন করা হবে। এদিকে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর নাগাদ সরকারি অনুদানে চলচ্চিত্র নির্মাণের লক্ষ্যে প্রস্তাব আহ্বান করা হয়। তবে চলতি বছর নির্ধারিত সময়ের দুই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত কোনো বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়নি। অর্থাৎ অনুদানের কার্যক্রম থেমে আছে।

বিদ্যমান অনুদান নীতিমালা অনুসারে সর্বোচ্চ পাঁচ এবং বিশেষ ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশিসংখ্যক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং সর্বোচ্চ পাঁচটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রকে অনুদান দেয়া হয়। এক্ষেত্রে এফডিসির কারিগরি সহযোগিতাসহ প্রতিটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রকে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। তবে নতুন নীতিমালায় অর্থের পরিমাণ ঠিক রাখার কথা বলা হলেও পরিবর্তন আসছে ছবির সংখ্যায়। একই সঙ্গে প্রণোদনানামের নতুন একটি ক্যাটাগরিও যুক্ত হচ্ছে। বলা হচ্ছে, বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী যতগুলো চলচ্চিত্রকে অনুদান দেয়া হতো, সে সংখ্যা কমিয়ে এনে সর্বোচ্চ তিনটি করা হবে। অর্থাৎ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যদি সাতটি পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি অনুদান পায়, তাহলে নতুন এ আইনে সে সংখ্যা কমে গিয়ে সর্বোচ্চ তিনটি চলচ্চিত্র এ অর্থসহায়তা পাবে। আর প্রণোদনা নামের নতুন ক্যাটাগরি সম্পর্কে বলা হচ্ছে: যেসব ছবি একেবারে নির্মাণ হয়ে গেছে, সেগুলোর মধ্য থেকে মূল্যায়নের ভিত্তিতে এর নির্মাতাকে অর্থ দেয়া হবে। এ অর্থের পরিমাণ নির্মাণাধীন ছবির অর্ধেক। এর মানে, অনুদানপ্রাপ্ত নির্মীয়মাণ একটি ছবি যদি ৬০ লাখ টাকা পায়, তাহলে নির্মিত ছবিটি প্রণোদনা হিসেবে পাবে ৩০ লাখ টাকা। তবে কোন প্রক্রিয়ায় এ প্রণোদনা দেয়া হবে, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো উল্লেখ নতুন নীতিমালায় নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে।

বিষয়টি নিয়ে টকিজের সঙ্গে কথা হয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অনুদান কমিটির অন্যতম সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব টেলিভিশন অ্যান্ড ফিল্ম স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. শফিউল আলম ভুঁইয়ার সঙ্গে। অনুদান নীতিমালার সংশোধনী নিয়ে শুরুতেই তিনি বলেন, ‘বিদ্যমান নীতিমালা মানার ব্যাপারে নির্মাতাদের মধ্যে সুষ্ঠু কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না এবং দিনকে দিন অনুদানের ছবির মান খারাপ হয়ে যাচ্ছে। যে কারণে অনুদানের নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে এবং এ সম্পর্কিত আমাদের পর্যবেক্ষণ ও মতামত সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছি। নীতিমালাটির সংশোধনীর কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।এরপর তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, অনুদানের ছবি সংখ্যা কমিয়ে এনে যে ছবি নির্মাণ হয়ে গেছে, সেখান থেকে বাছাই করে এর নির্মাতাকে প্রণোদনা দেয়ার কারণ কী? তার উত্তর: একটি ভালো ছবি উপহার দেয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ একজন নির্মাতাকে এ অর্থ দেয়া হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে অনুদান দেয়ার মূল কারণের মধ্যে রয়েছেমেধাবী একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা যাতে অর্থ সংকটের মুখোমুখি না হয়ে নির্বিঘ্নে তার ছবিটি নির্মাণ করতে পারেন, সেটা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে বাংলাদেশের তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বেশির ভাগই অর্থ সংকটে ভোগেন। অনুদানের ক্ষেত্রে তরুণ নির্মাতাদের মধ্য থেকে প্রতি বছর দু-একজন অগ্রাধিকার পেলেও বিশালসংখ্যক নির্মাতাই অর্থাভাবে তাদের ছবির কাজ শুরু করতে পারেন না। দেশের চলচ্চিত্রের এমন পরিস্থিতিতে নির্মাণ হয়ে যাওয়ার পর অর্থ বরাদ্দ কতটা যৌক্তিক, এমন প্রশ্নে শফিউল আলম বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, অনুদানের অর্থ দিয়ে ছবির কাজ শেষ করেন না নির্মাতা। অন্যদিকে নিজের প্রচেষ্টায় যে নির্মাতা ভালো ছবি বানাবেন, তাদের তো উৎসাহিত করা উচিত।তবে শফিউল আলমের এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন জ্যেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম। বিষয়টি সম্পর্কে এ নির্মাতা বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, যে ছবির কাজ হয়ে গেছে, সেটাকে অনুদান দেয়ার কোনো কারণ নেই, আমি এটাকে সমর্থন করি না। বরং ছবির সংখ্যা কমিয়ে এনে অনুদানের টাকার অঙ্ক বাড়ানো যেতে পারে এক্ষেত্রে, যাতে করে নির্মাতাকে সহপ্রযোজকের দ্বারস্থ হতে না হয়।

একই সঙ্গে এ নির্মাতা প্রণোদনা দেয়ার নিয়ম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তার প্রশ্ন: পুরোপুরি নির্মিত অসংখ্য ছবির মধ্য থেকে কোনটি ভালো, কোনটি মন্দ, তা কীভাবে নির্ণয় করা হবে আর করবেইবা কারা?’ এ রকম বিষয়াদি নীতিমালায় সংযোজন হলে তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য হতাশার কারণ হতে পারে কিনা নিয়ে মোরশেদুল আরো বলেন, ‘ধরুন, অনুদানের জন্য ছবির সংখ্যা কমিয়ে চারটি করা হলো। সেক্ষেত্রে এর মধ্যে দুজন তরুণ নির্মাতা ও দুজন প্রবীণ নির্মাতার ছবিকে অনুদান দেয়া হবে, নীতিমালার মধ্যে এ রকম বিষয় রাখা উচিত হবে। আমার কাছে মনে হয়, নতুনদের জন্যই অনুদানটা কাজে আসে বেশি।’<o:p></o:p>

মেঘমল্লারছবিখ্যাত নির্মাতা অঞ্জন জাহিদুর রহিম মনে করেন, একজন তরুণ নির্মাতাকে ছবি নির্মাণের আগেই পুরো অর্থসহায়তা দেয়া উচিত। কারণ এ রকম একজন নির্মাতার পক্ষে প্রযোজক পাওয়াটা মুশকিলই বটে। সেক্ষেত্রে তার বক্তব্য, ‘আমি মনে করি, আরো বেশিসংখ্যক তরুণ নির্মাতাকে অনুদান দেয়া উচিত এবং যথাসময়ে ছবি নির্মাণের বাধ্যবাধকতা তৈরি করা উচিত।একই সঙ্গে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে উদ্ধৃত দিয়ে বলেন, ‘ছবি নির্মাণে তরুণ নির্মাতাদেরকে বিশেষভাবে সাহায্যের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও তার প্রত্যয়ের কথা ব্যক্ত করেছেন। আমার মনে হয়, তার বক্ত্যবের প্রতিফলন এ নীতিমালায় থাকা উচিত।

অনুদান নীতিমালার সংশোধনী ও এখন পর্যন্ত চলতি বছরের অনুদানের জন্য প্রস্তাব আহ্বান না করাসহ পুরো বিষয়টি নিয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (চলচ্চিত্র) শাহীন আরা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি বিদেশ সফরে থাকায় তার কোনো মন্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। এরপর এর ভারপ্রাপ্ত উপসচিব পরিমল সরকারের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি পুরোপুরি অবগত নই, তাই এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে পারব না।

চলচ্চিত্রে বিদ্যমান অনুদান প্রক্রিয়া নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে নানা মহলে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। অনুদানের জন্য ছবি বাছাই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব, অনুদান পাওয়ার পর ছবি নির্মাণ না করে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখাসহ নানা কারণে এমনিতেই সরকারি অনুদান নিয়ে বিতর্ক বিদ্যমান। এমন পরিস্থিতিতে যুগোপযোগী উপায়ে এবং ধীরেসুস্থে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে নতুন একটি নীতিমালা তৈরি, এ নিয়মের অধীনে চলচ্চিত্রকে অনুদান দেয়া এবং নির্মিত ছবি দর্শকের কাছে পৌঁছানোর ব্যাপারে যুক্তিযুক্ত পরিকল্পনা সাজানো হবেসরকারের কাছে এমনটাই প্রত্যাশা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের।

সৌজন্যে: বনিকবার্তা.নেট

রুবেল পারভেজ