বাবার বুকের শেষ উত্তাপ

June 18, 2017, 5:13 a.m. মতামত


আবদুল হাসিব

সাত বছরের দূরন্ত চলচঞ্চল বালকটি যখন হাঁটছি খেলছি, ছুটছি নীলিমায় মুক্ত স্বাধীন বিহঙ্গের মতো ঠিক সেই সময় হঠাৎ একদিন সূর্য উঠার কিছুটা সময় আগে, আমার কঁচি হাতটি ছেড়ে চির দিনের মতো চলে গেলেন আমার গর্ভধারিণী, আমার জন্মধাত্রী জননী, আমার অপার অনিঃশেষ প্রশ্রয় প্রশান্তির নিকুঞ্জ; আমার স্নেহময়ী ‘মা’! পৃথিবীর সূর্যোদয়ের সাথে চিরতরে অস্তিমিত হয়ে গেলো আমার মায়ের জীবন সূর্য। আমি বাকি সকলের মাঝে অবস্থান করেও হয়ে গেলাম একা, একেবারে একা! হয়ে গেলাম কষ্টে কাতর মাতৃহীন এক বিষন্ন বালক।
সাত বছর বসয় থেকে জীবনকে নতুন মাত্রায় চিনতে শুরু হয়ে যায়। শুরু হয় অকল্পনীয় অনাকাক্সক্ষীত জীবনের বন্ধুর পথ দিয়ে কঠিন যাত্রা। বাবা! হ্যাঁ; ছিলেন। বাবা তার উজাড় করা ভালোবাসা ঢেলে দিয়ে উভয় কূলের কুবোষ্ণ আদর মিশায়ে প্রচেষ্টার ত্রুটি রাখেন নি আমার অপরিসীম শূণ্যতার মাঝে পরিপূর্ণতার জোয়ার বইয়ে দিতে। কিন্ত এই অসম্ভব কাজটি কারো পক্ষেই সম্ভব হয়নি। তবে, বাবা অনেকটা করতে পেরেছেন ভেবে তৃপ্তি পেথে আমি তাকে বহুবার দেখেছি, অথচ আমি শতাংশের একাংশও তৃপ্ত হইনি। কারণ যাকে হারিয়ে আমার সমস্ত ভেতর শূণ্যতার হাহাকারে ব্যতিত বিধুর, যার অভাবের আমার ভেতর খররোদ্দুর উত্তাপে বিরান মরুভূমি; সেখান শান্তির শৈত বাতাস হিমেল পরশ দিতে বার বার ব্যর্থ হয়েছে।
দুঃখকে চেপে রেখে আড়ালে আবঢালে নিরবে নির্জনে কাঁদবার স্বভাবটা সেই শৈশব থেকেই। আমার সেই স্বভাব সুলভ আচণের কারণে বাবাও অতো করে ভেবেচিন্তে দেখবার সুযোগ পাননি। সরাসরি যেটা দেখেছেন সেটা নিয়ে ভেবেছেন, সমাধানের প্রাণপন চেষ্টা করেছেন, কদাচিত সফল হয়েছেন; বেশীরভাগ সময়ই চরমভাবে ব্যর্থও হয়েছেন। ব্যর্থ তিনি তখনই হতেন, সৎ মা এবং সন্তান নিয়ে যখন উভয় সঙ্কটে পড়তেন। এভাবে ছোট বড় ভাঙাগড়ার মধ্যদিয়ে আঁকাবাঁকা হয়ে প্রবাহিত হয়েছে আমার জীবন নদীর চব্বিশটি বছর। চব্বিশটি ফুলেল বসন্ত নয়, পার হয়েছে কঠিন ঝড়ঝঞ্ঝা অতিক্রান্ত করা দুঃখ সুখের কমল-কাঁটা সম্পৃক্ত চব্বিশটি বছরের সুদীর্ঘ সময়।
আজ থেকে বাইশ বছর আগে যখন বিদেশে চলে আসবার উদ্দেশ্যে সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার থেকে বার বার ঢাকা আসছি আবার বিয়ানীবাজার ফেরত যাচ্ছি, দুঃখের শতচিহ্ন ক্ষত বুকে ধারণ করে আষাঢ়ে মেঘ হয়ে গুরুগম্ভীর ঘুরছি। দুঃখের ধ্রুপদ রাগিণী অষ্টপ্রহর বাজছে বুকের ভেতর তবুও কারো কাছে একটি টাকা পয়সাও যেমন চাইনি, তেমনি কাউকে কিছু বলিনি; এমন কি বাবাকেও না। কানাডা আসার ব্যাপারে তিনবার যখন দিন তারিখ ঠিক হয়েও ঢাকা থেকে ফ্লাইট হয় না, কোন না কোন একটা অজুহাতে ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায়; তাতে করে উদাসীনতা যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে আমার হতাশা। এমন এক দুদুল্যমান পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে আমি যখন ঢাকার হোটেল নিশিবাস আর হোটেল সেল্টারে সময় গুণছি, দিনরাত্রি কাটাচ্ছি, তখনকার এক গভীর রাতে স্বপ্নে দেখলাম, জনৈক নারী, যাকে আমি স্পষ্ট চিনে উঠতে পারিনি। উনি আমাকে আদেশের সুরে বলছেন, ‘হাসিব, তুমি বাড়ীর উঠোনে যাও; বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারটি তোমার জন্মদাতা পিতার কাছে গিয়ে খুলে বলো, তবেই তোমার ফ্লাইট হবে, তবেই তোমার বিদেশ যাওয়ার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে।’ বাবাকে বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারটা অবগত করছি না, সে অপরাধবোধ আমাকে অবশ্যই অহোরাত্র দগ্ধ করছে। অন্যদিকে অব্যক্ত চাপা একটা কষ্ট আমাকে তা করতে সাহসী এবং পাষাণ করছে। স্বপ্ন দেখার পরের সকালেই চলে যাই ঢাকা সোনার গাঁ হোটেলের প্রথম তলায়, কেএলএম. এর অফিসে সেল্স ম্যানেজার সাম্মি সাহেবের কাছে। সাম্মি সাহেবকে ফ্লাইটের পরবর্তী তারিখ জিজ্ঞাস করলে তিনি প্রায় ৯০% নিশ্চয়তা দিয়ে জানালেন যে, ‘আশা করি পাঁচ সাত দিনের মধ্যে আপনার ফ্লাইট এর একটা সুব্যবস্থা হয়ে যাবে।’ আমার দেশের বিশেষ করে ট্রাভেল এজেন্সির পারসেন্টিজ এর ব্যাপারটা যদিও আমার জানা আছে তবুও সাম্মি সাহেবের ‘আশা করি’ শব্দটির সাথে আমার বুকের ভেতর বিশ্বাসের শক্ত সেতু নিঃমেষে নির্মিত হয়ে গেলে আমি অফিস থেকে বের হয়েই সোজা কমলাপুর রেল স্টেশ্যানে চলে যাই। সেখান থেকে শাহজালাল এক্সপ্রেস যোগে বাড়ি অভিমুখে রওয়ানা দেই। উদ্দেশ্য বাবার সাথে ক’টা রাত কাটাবো এবং সবকিছু খুলে বলবো। রাত প্রায় একটার দিকে বাড়ি এসেই বাবার বুকে মাথা রাখলাম। বাবার জড়িয়ে নেয়াতে বুঝাই গেলো এঘরের সবার ছোট ছেলেটি এখনও বড় হয়নি। সেদিন সেই রাতে অবাক বিশ্ময়ে বাবা আমার মুখের দিকে স্থীর পাহাড়ের মতো তন্ময় থাকিয়ে অনেকক্ষণ কিছু যেন দেখছিলেন, কিছু যেন খুঁজছিলেন। কে জানে, হয়তো বা তখন আমার মুখাবয়বে জন্মলগ্নের লেগে থাকা কোন দাগ, কোন ক্ষুদ্র চিহ্ন খুঁজছিলেন নয়তো বা পরখ করে দেখছিলেন, কী ভাবে আমি আমার বুকের ভেতরের নরম জমিনে দুঃখের চারাগুলো সযতেœ রোপন করে রেখেছি। লো ভল্টেজের বিদ্যুত বাতির নরম আলো যখন আমার বাবার চোখে ধরিয়ে দিলো, আমার চোখ থেকে নিস্পন্দ বর্ষা গড়িয়ে নামছে; তখন পাহাড়ের মতো স্থীর হয়ে থাকা আমার বাবার বুকের ভেতর কষ্টের জলোচ্ছ্বাস উন্মতাল হয়ে উঠলে তাঁর দুচোখ দিয়ে খরস্রোতা নদী বইতে থাকলো। শৈশবের মতো করে বাবা আমাকে তাঁর প্রাক্তন আসক্তিতে বুকে জড়িয়ে নিয়ে আমার ললাটে আদর মেখে কাঁদতে কাঁদতে যে দুর্লভ কথা গুলো সে দিন সে রাত্রে আমাকে বলেছিলেন, সে গুলো আজকের এই রচনায় এতো স্বল্পপরিসরে আনতে পারছি না। এতো বড় বড় কথা, যার ভাবার্থ জীবনভর আমার কাছে এতো গভীর, কী করে কথাগুলোর ব্যাখা বিশ্লেষণ এখানে আমি দেই! সুতরাং আমার কাছে রেখে যাওয়া আমার বাবার বাণীগুলো অপ্রকাশিত রয়েই যাক এবং আমার বুকের ভেতর সযতেœ রক্ষিত থাকুক; ওটা ওখানেই আমৃত্যু অক্ষত অটুট থাকবে।
বাবার বুকের শেষ উত্তাপ আমি নিয়েছিলাম, ২২শে সেপ্টেম্বর, ১৯৮৭ সাল, রোজ মঙ্গলবার, সকাল ১০:৩০ মিঃ এর শেষ অনু সেকেন্ড পর্যন্ত। বাড়ির সামনে প্রকান্ড পুকুর, পুকুরের পূর্ব প্রান্ত ঘেঁসে গোরস্থান। বিদায় প্রাক্ষালে আমার ভাইবোনরাও উপস্থিত ছিলেন। বলাবাহুল্য আমি ছিলাম পরিবারের সবার ছোট। আমার অসুস্থ বাবা তাঁর হাতের লাটিতে ভর দিয়ে দিয়ে পুকুর পাড় পর্যন্ত এসেছিলেন। গোরস্থানকে সামনে রেখে আমরা সবাই দাঁড়ালাম জিয়ারত করবার মানসে। কৈশোরের মতো করে বাবা আমাকে তাঁর বুকের সামনে রেখে মায়ের কবর জিয়ারত করলেন। মোনাজাতের সময় বাবা জোরেসুরে অশ্রুসজল চোখে খোদার দরবারে যেমন করে বললেন, তেমনি মায়ের রোহানিকে উদ্দেশ্য করেও বললেন, ‘তোমার পাগলের জন্যে দোয়া করো, তার যখন একমাত্র উদ্দেশ্য স্বদেশ ছেড়ে বিদেশ যাবে; সুতরাং তার এই আশাটা যেন পূর্ণই হয়ে যায়।’ মোনাজাত শেষে বাবা তাঁর প্রশান্ত বুকের ভেতর আমাকে জড়িয়ে নিয়ে বাচ্ছাদের মতো করে খুব কাঁদলেন। তাঁর চোখের উষ্ণ পানি আমার মাথার উপর টপ্ টপ্ করে ঝরে পড়ে মাটিতে ছিটকে পড়তে দেখে আমি আরো অশান্ত অস্থির হয়ে ওঠি। এই প্রথম আমার বুকের ভেতর একটা অপ্রত্যাশিত আশঙ্কা মূর্তিমান হয়ে উঠলো। আমি স্পষ্ট যেন দেখতে পাচ্ছিলাম, কী ভাবে আমি আমার বাবাকে হারিয়ে ফেলবো। বার বার কেন যেন আমার মন বললো, এইবার আমার ফ্লাইট আর বাতিল হবে না, আমার বিদেশ যাওয়া হয়ে যাবে; আমি আসলেই কানাডা চলে যাবো। আর যেদিন জীবনের স্বপ্ন পূরণ করে স্বনির্ভর হয়ে চোখেমুখে সফলতার উজ্জ্বল উদ্ভাস মেখে বাড়ি ফিরবো, সেদিন হয়তো আমি আমার বাবাকে আর খুঁজে পাবো না। এমন এক অনাকাক্সিক্ষত ব্যঞ্জনাময়ী বেদনায় আমার ভেতরখানা ভরে উঠলে আমার দেহখানা তখন বাবার স্নেহমাখা বুক থেকে কিছুতেই যেন নিয়ে আসতে পারছিলাম না। উপস্থিত স্বজনরা তখন বাবার বুক থেকে আমাকে ছাড়িয়ে আলাদা করে গাড়িতে তুলে দেন। পিছন ফিরে চেয়ে দেখলাম বাবা আমার কাঁদতে কাঁদতে আর কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে বসে গেছেন এবং বাচ্ছাহারা হরিণের মতো অব্যক্ত কষ্টে ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে অপলক থাকিয়ে চোখ মুছছেন। আমি ঝাপসা চোখ নিয়ে নির্মম ভাবে মুহুর্তে বাবার দৃষ্টিার আড়ালে চলে যাই। কঠিন ধাতব যন্ত্র গাড়ি আমাকে পাষাণের মতো শো শো করে নিয়ে ছুটে চললো গন্তব্যের পানে।
১৯৮৭ সালের ২২ শে সেপ্টেম্বর, রোজ মঙ্গলবার, সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার কসবা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে বের হয়ে ঢাকায় এসে টিকেট কনফারমেশ্যান সংক্রান্ত জটিলতা হেতু হোটেলে আরো চৌদ্দ দিন অবস্থান করবার পর ৬ই অক্টোবর, রোজ মঙ্গলবার, সকাল ১১:০০ টার সময় দুর্বাশিশির ভেজা জন্মভূমির স্নেহমাখা মাটি ছেড়ে কানাডার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। ঢাকা থেকে কলকাতা, কলকাতা থেকে দিল্লী, দিল্লী থেকে অ্যামস্ট্রাডাম, অ্যামস্ট্রাডাম থেকে আমার গন্তব্য কানাডায়। কানাডার টরন্টো প্যায়ারসন্স এ্যায়ারপোর্ট ৭ই অক্টোবর ১৯৮৭, রোজ বুধবার, বিকাল ৬:০০টায় এসে অবতরণ করি।
১৯৮৭ এর ৮ই অক্টোবর এর রৌদ্রুজ্জ্বল সকাল থেকে শুরু হয় আমার প্রবাসের নানা বৈশিষ্টে মন্ডিত বৈচিত্রময় যাপিত জীবন। ১৯৮৭ সালে টেলি যোগাযোগের এমন ব্যাপক সুবিধা সমৃদ্ধি ছিলো না। বিদেশ আসার এক বছর পর বাবার সাথে কথা বলবার তীব্র ভাসনার কথাটা আমার ভাগনা নোমানকে জানালে, সে বাবাকে নিয়ে সিলেট শহরে এক আতœীয়ের বাসায় আসলে সেদিন আমি প্রাণভরে আমার বাবার সাথে টেলিফোনে কথা বলেছিলাম; প্রায় সোয়া ঘন্টার মতো। এরপর আর কোন কথা বলা হয়নি বাবার সাথে শুধু চিঠি দ্বারা যোগাযোগ ছাড়া। বৈধ কাগজ পত্র ছিলো না বলেই বাবার বুকে আমার আর মাথা রাখা হয়নি। বাবাকে আরো একনজর দেখা বা আরো একটিবার স্পর্শ করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। মৃত্যু সংবাদ শুনে, ৩৪৫০ ঐঁপযরংড়হ ঝঃ.# ৭০৪ এর কক্ষ থেকে আমি যখন পাগলপ্রায় হয়ে কন্ঠছিড়ে বাবাকে ডাক দেই সেই ডাক তখন বাবার কর্ণকোহরে প্রবেশ করেনি; কারণ আমার বাবা তখন স্থায়ীভাবে পরবারের বাসিন্দা হয়েই গেছেন। বাবা মারা গেছেন সেটা নিশ্চিত। কিন্তু ঘটনাটা আমার চোখের আড়ালে ঘটেছে বলেই আমার মনকে বুঝাতে দিন অনেক ব্যয় করতে হয়েছিলো। বাবার মৃত্যু সংবাদ শুনার পর কাজ থেকে এক সপ্তাহ ছুটি পেয়েছিলাম। হ্যাঁ; এই এক সপ্তাহ বাবাকে ঘিরে গত জীবনের সুদীর্ঘ ছবিগুলো বুকের ভেতর থেকে চোখের পাতায় এসে অশ্রুর প্লাবণে প্রদর্শিত হয়েছে অহোরাত্র অনুক্ষণ। কৈশোরের স্মৃতিগুলো বারে বারে মূর্ত হয়ে ভেসে উঠেছে। ভেসে উঠেছে বাবার হাত ধরে সকালে ঘুরে বেড়ানোর ছবি, সাথে বসে প্রতিদিন সকালে ভাত খাওয়ার দৃশ্য। তখনকার সময় রাস্তা-ঘাট আজকের দিনের মতো এতো উন্নত ছিলো না বিধায় আতœীয় স্বজনদের বাড়িতে পায়ে হেঁটেও যেতে হয়েছে অনেক পথ। মনে পড়ে যায় কিছুটা পথ হেঁটে গিয়েই বলতাম, ‘বাবা আমি আর হাঁটতে পারবো না, পায়ে ব্যথা করে।’ তখন আর কী করা, বাবা তখন সাথে সাথে কাঁধে তুলে নিতেন। কাঁধে চড়ে বুবুর বাড়ি যাওয়া, নানা বাড়ি যাওয়ার সেই কচিকাঁচা ছবিগুলো তখন মর্মপীড়া বাড়িয়ে আমাকে অস্থির করে তুলেছিলো। আরো একটিবার বাবাকে দেখবার জন্যে সেদিন আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে আবদার জানিয়ে উর্ধ্বপানে চিৎকার করতে ইচ্ছে হয়েছিলো। ছুটির একটি সপ্তাহর বেশীর ভাগ সময়ই জায়নামাজে বসে বসে তাঁর জন্যে প্রার্থনায় বুক ভাসিয়েছি। হ্যাঁ; অশ্রু বিসর্জনে কষ্টের পাহাড় বিগলিত হয়েছে; বুক অনেকটা হাল্কা হয়ে ওঠেছে। মানুষের জীবনে কখনো কখনো কিছু কিছু কঠিন কষ্ট এসে উপস্থিত হয়, মানুষকে তখন নিরবে অশ্রু বিসর্জন দেয়া ছাড়া আর শ্রেয়তম কোন পথ থাকে না।
আমার পরবাসের বয়স যখন দুই বছর সতেরো দিন, ঠিক সেই সময় অর্থাৎ ১৯৮৯ সালের ২৪ শে অক্টোবর, রোজ মঙ্গলবার, কার্তিকের স্নিগ্ধ সকালের শিশিরে স্নাত হয়ে ১১ঃ৩০ মিঃ এর সময় বাবা আমার এই প্রাঞ্জল পরমা সুন্দর বসুমতির বুক থেকে চিরবিদায় নিয়ে চলে যান। (ইন্না লিল্লাহি ——–রাজেউন।) আমিও অক্টোবরের এক মঙ্গলবার সকালে বাবার বুক খালি করে স্বার্থপরের মতো পাষাণে বুক বেঁধে সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটের সময় চলে এসেছিলাম স্বপ্নীল সুখের আশায় কষ্টকঠিন এই পরবাসে। স্বজনদের মুখে শুনেছি, প্রিয়জনদের পত্র পাঠান্তেও জেনেছি, পরলোক গমণের মাত্র তিনদিন পূর্বে আমার বাবার প্রচন্ড জ্বর ওঠেছে। বাবা তখন দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট দেখতে পেরেছিলেন তিনি আর ওখানে থাকছেন না। তিনদিন পর ওখানের সকল মায়াজাল ছিন্নভিন্ন করে, সকল লেনদেনের যবণিকা টেনে চলে যাবেন চির অজানা অসীমের দিকে। তাই সকলকে তাঁর চারিপাশে ঘিরে বসে সব সময় র্কোআন তেলাওয়াত করাবার জন্যে অনুরোধ করেছেন। এবং সকলেও তাই করেছেন। ভাইবোনদেরকে খবর দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন শান্ত সুস্থীর মনে। যে যেখানে ছিলেন সবাই এসে জড়ো হয়েছেন। উপস্থিত হতে পারেন নাই আমরা আটজন ভাইবোনদের সবার বড় লন্ডনস্থ বোন হাওয়ারুন। আর উপস্থিত হতে পারিনি পরিবারের সবার ছোট আমি হতভাগা কপালপুড়া হাসিব। সকলের বড় আর সকলের ছোট! ওদের জন্যে মা বাবার হৃদয়ের আলাদা একটা টান থাকে, যা সকলক্ষেত্রে বুঝানো যায় না, অস্বীকারও করা যায় না। বোনটার বৈধ ভ্রমণ কাগজ-পত্র ছিলো, কিন্তু তাঁর স্বামীর সংসার তাকে পায়ে বেড়ি দিয়ে আটকে দিলো। শেষবারের মতো বাবার মুখখানা দেখতে পারলো না। পারলাম না কানাডার ইমিগ্রেশ্যান কিংবা বৈধ কাগজ পত্রের অপেক্ষাকে তুচ্ছ করে সকল কিছু ফেলে বাবার পানে ছুটে যেতে। শুনেছি আমরা দু’জনের জন্যে প্রতিক্ষার অন্তঃহীন প্রহর কেটেছে বাবার! তিনি নাকি বার বার বড় মেয়ে হাওয়ারুনের কথা আর আমার কথা বলেছেন। আমাদেরকে কাতর সুরে ডেকেছেন অনেক অনেকবার। মৃত্যুর মাত্র কয়েক মিনিট আগে আমার বড় ভাই বাবাকে শান্তনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন. ‘বাবা, তোমার হাসিব সিলেট এ্যারপোর্ট পর্যন্ত এসে গেছে, বাড়ি এসে পৌছতে আর বেশী বাকি নেই বাবা, একটু ধৈর্য ধরুণ।’ আমার বাবা নাকি তখন বড় ভাইকে উত্তরে বলে দিয়েছিলেন, ‘হাসিব আসতে পারবে না রে, কারণ কানাডায় তার বৈধ কাগজ-পত্র এখনও হয়নি; যার জন্যে সে আসতে পারবে না। তোমরা আমাকে আর শান্তা দিতে হবে না। হাসিবকে বুঝিয়ে সুজিয়ে বলিও আমার ছোট্ট শিশুটি যেন আমার জন্যে খুব করে না কাঁদে; শৈশবে মা হারিয়ে অনেক তো কাঁদলো! আরো বলিও আমি তার জন্যে প্রাণখুলে আমার রাব্বুলআল্আমিনের কাছে দোয়া চেয়ে যাচ্ছি, সে খুব ভালো থাকবে।’ হ্যাঁ আমি নিখুঁত স্বার্থপর। বাবার দোয়ায় খুবই ভালো আছি। ভালো আছি স্ত্রীর সুখে সুখী হয়ে, ভালো আছি প্রতি ভোরে পুত্রত্রয়ের কচিমুখগুলো দর্শনে, ভালো আছি সংসারের সার্বিক সমৃদ্ধিও পূর্ণতার পরিতৃপ্তি নিয়ে।
যেদিন আমার বাবা মারা যান, সেদিন আমি অতিদূর সমুদ্রের ওপার থেকে শুধু সকল শুভাকাক্সক্ষীর অশ্রুসজল রোদন শুনিনি, আমি সকরুণ কান্না শুনেছি আমার বাবার হাতের লাগানো বাড়ির বৃক্ষরাজিদের। বাবার বিদায় প্রাক্ষালে সড়সড় শব্দে বেদনায় কেঁদেছে বাড়ির সুপুরি সারি, বাড়ির দক্ষিণে বেণুবনের চিরুনি পাতাগুলো বাতাসে কেঁদে কেঁদে সুর তুলেছে। কেঁদেছে বাবার ব্যবহৃত জামা কাপড়, বিশ্রামের বিছানা-বালিশ, খাট পালঙ্ক, রোদ পোহাবার ইজি চেয়্যারখানা। কেঁদেছে চারি পাশের ফুল গুল্ম লতা ঘাস, জন্মলগ্ন পুকুরের শীতল জল, কেঁদেছে বনের বিহঙ্গ, আকাশের মেঘ, নদীর পানি। গোরস্থানের গোরে নিয়ে রাখবার আগে বড়ই পাতার গরম পানি দিয়ে গোসল শেষে আতর গোলাপ মাখিয়ে শুভ্র কাফনে সমস্ত শরীর আবৃত করে শেষ বারের মতো যখন উঠোনে রাখা হয়েছিলো তখন আমার বাবার শৈশবের উঠোনের প্রতিটি কাকর প্রতিটি ধুলিকণা চিরবিচ্ছেদে চিৎকারে কেঁদে কেঁদে উঠতে সেদিন আমি ওপার থেকে জীবন্ত শুনেছি। আর সকল কিছু না কাঁদবে কেন? কারণ মানুষটি তো বসুন্দরার বুক থেকে চিরবিদায় নিয়ে নিরব অভিমানে অনিচ্ছায় চলেই যাচ্ছেন। লোকটি যে কোনদিন আর ওখানে আসবেন না। যে লোকটি কোনদিন কারো কোন ক্ষতি করেন নি; বিধাতার সৃষ্টির সকল কিছুর প্রতি যার ছিলো অগাধ অসীম ভালোবাসা, সেই লোকটির জন্যে সকল কিছুর কাঁদবার কেন দরকার থাকবে না? আমিই বা আমৃত্যু কাঁদবো না কেন। বাবার স্থানটা তো কারো সাধ্য নেই পূরণ করবার। তিনি তো আমারই জন্মদাতা বাবা, আমারই পরম পূজণীয় পিতা। আমার বাবার জন্যে আমি শুধু আশা করি না, আমি স্রষ্টার কাছে দাবি রাখি, আমার পিতার নিশ্চিত জান্নাতের জন্যে। আমার বুকের ভেতর অকৃত্রিম বিশ্বাস আছে, এমন সরল সুন্দর উদার হৃদয়বান আমার পিতার জন্যে পরম করুণাময় রাহমানুর-রাহীম নিশ্চয়ই বরাদ্ধ করে রাখবেন, জান্নাতের একখানা শান্তিময় নির্মল নিবাস; যার আঙিনায় থাকবে অনিন্দ্য সুন্দর অনন্ত বসন্তবাগান আর নিবাস গৃহের পাশ ছুঁয়ে বয়ে যাবে ঝর্ণার শৈত স্রোতধারা।
আমার মা-বাবা দু’জনই আজ আর বেঁচে নেই। আমাদের পারিবারিক গোরস্থানের কোমল মাটির মায়ায় তাঁরা দু’জনই পাশাপাশি শুয়ে আছেন। দেশে যাই, খুব বেশী যাই। দু’বছর তিন বছর পর পর যাই। সাবাইকে নিয়ে যাই, একাও যাই। স্বদেশের মাটিতে গিয়েই অজু করে গোরস্থানের সামনে গিয়ে উপস্থিত হই, মা বাবার শিয়রে সবুজ চত্তরে দাঁড়িয়ে অশ্রু বিসর্জনে শুধু প্রার্থনা করি আর কিছু পারি না! অথচ কতোকিছু করবার চায় বিবাগী এই মনটা। হ্যাঁ; আমার মা-বাবা তাঁরা দু’জনই নেই, কিন্তু আমার মা বাবার পূতপবিত্র নিঃস্বার্থ দোয়া যে অহর্নিশি আমার জীবনের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে এবং আমার চলার পথে তা যে কাজ করছে; এই অশরীরী অধরা শক্তির কর্মক্ষমতা আমি প্রতিদিন প্রতিমুহুর্তে ঘুমে ও জাগরণে স্পর্শ করেই যাচ্ছি। আমার বাবার বুকের সেই সর্বশেষ উত্তাপটুকুর রেশ আমার বুকের ভেতরের অনুভুতিতে কোনদিনও নিরুত্তাপ হবে না। ওটা থাকবে জীবন্ত দিবারাত্র একান্ত অনুভূত অনির্বাণ।
১৯১০ সালের দিকে আমেরিকান নাগরিক সোনার স্মার্ট ডোড্ জুন মাসের তৃতীয় রবিবারকে ‘বাবা দিবস’এর সূচনা করে ১৯৬৬ সালে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায়ের মধ্যদিয়ে জাতীয় মর্যাদায় অধিষ্টিত করে গেছেন। এবং সুদূর অতীত থেকে পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে ‘বাবা দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু আজকাল প্রতার এই ডেউ গিয়ে লাগছে সারা বিশ্বে, বিশাল বর্ণাঢ্যে সানন্দে সমারোহে। কিন্তু আমার ব্যক্তি জীবনে মা দিবস, বাবা দিবস এবং ভালোবাসা দিবস ওগুলো তিনশত পয়ষট্টি দিনই লেগেই থাকে আমার বুকের নরম প্রলেপ জুড়ে। আমি তাকে এককে নিয়ে আলাদা করতে পারি না। তবুও বাবা দিবসটি যাদের জন্যে প্রযোজ্য তাদের জন্যে থাকলো শুভ কামনা।

blog comments powered by Disqus