ভাঙা পরিবারের মানুষ ও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

June 17, 2017, 6:46 p.m. মতামত


জারিন নিম্মি :

" ভাঙ্গন " বা "ভাঙ্গা" শব্দ দুটির মাঝেই যেন একরকম কষ্ট অনুভূত হয়। বিশাল তরঙ্গ স্রোতে নদীর ভাঙ্গন যেমন টা কষ্ট দেয় ঠিক তেমনি যত্ন করে রাখা ছোট্ট চায়ের কাপ টি ভাঙলেও মন তত টাই কষ্ট পায়। রোজ রোজ কত কি না ভাঙছে আমাদের চারিপাশে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র থেকে বিশালাকার কত কিছুই। ভাঙছে মন, ভাঙছে পাহাড় আর ভাঙছে সংসার।
আশা আকাঙ্ক্ষা সুখের  মিশেলে তৈরি হওয়া পরিবার গুলো ভেঙে টুকরো হয়ে যাচ্ছে মহামারীর মত যেন সমাজ পাল্টে গেছে। উন্নয়ন আর প্রগতিশীলতার ছোঁয়া লাগলেও নাক সিটকানো মনোভাবের পরিবর্তন হয়নি এই ভাঙা পরিবার বা ব্রোকেন ফ্যামিলি গুলোর প্রতি  এই সমাজে। এই পরিবারের সন্তান গুলো আজও অবহেলিত সমাজের চোখে। যে দৃঢ় প্রত্যয়ে একজন সিঙ্গেল মা তার সন্তানদের বড় করে তোলেন এক ধাক্কায় যেন সেটা ম্লান হয়ে শুধু ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তান বলে।
এটা শুধু আমাদের এই সমাজেই সম্ভব কেননা মন মানসিকতা এখনো সংকীর্ণ হয়ে আছে আমাদের। স্কুল কলেজে সহপাঠী রা কেউ কেউ তীর্যক দৃষ্টিতে দেখে এদের। সব চাইতে করুণ পরিস্থিতির অবতারণা হয় বিয়ে শাদীর ক্ষেত্রে। সুযোগ্য পাত্র বা পাত্রী কে অপাত্রে ঠেলে দেয়া হয় শুধুমাত্র ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তান বলেই। শুধু তাই নয়। অপাত্রে বিয়ে শাদী হলেও সেই পরিবার গুলোও জিম্মি করে রাখে কোন কোন ক্ষেত্রে করুণার দৃষ্টিতে। ভাঙা যেন আজীবন ই ভেঙে থাকে এদের জীবনে।
এক জন নারী যখন ডিভোর্সি, এ সমাজ তাকে নানা ভাবে উত্ত্যক্ত করে। পরিবার, প্রতিবেশী বা চাকরি ক্ষেত্রে সহকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া বাঁকা কথা হজম করা ডিভোর্সি নারী পুরুষরা এ সমাজের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমি বা আপনি সম্মুখে যতই বুলি ফোটাই বা সহানুভূতি দেখাই, এদের অগোচরে কটুক্তি করতে ছাড়ি না কেউই। সিঙ্গেল মায়েরা ছেলেমেয়ে দের শ্বশুড়বাড়ি তে যেন একটা হাসি কৌতুকের পাত্র। যে কষ্ট করে সন্তান দের বড় করে সুশিক্ষিত করে বিয়েশাদী দেয় তার পুরস্কার সে লাঞ্ছনা ছাড়া কিছু পায়না সন্তানদের শ্বশুড়বাড়ি থেকে।
আমরা কি কখনোই এই গন্ডি থেকে বেরুতে পারবোনা? পারবো না আমাদের মনোভাবের পরিবর্তন করতে।আবার কোন কোন ভাঙা সংসার কে জোড়া দেয়াতেও প্রচুর কথার সৃষ্টি হয়। কোন পুরুষ কোন ডিভোর্সি নারী কে বিয়ে করলে নানান কথা কটুক্তির স্বীকার হন।আবার কোন কোন সিঙ্গেল মা তার সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে একাই কাটিয়ে দেন তার জীবন। যখন সন্তান রা বড় হয়ে আলাদা হয়ে যায় বা বিয়ে শাদী হয়ে যায় তখন তার দায়ভার যেন কেউই নিতে চায়না। যদিও বা কখনো পড়ন্ত বয়সে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয় তখনো সমাজ সংসার তাকে নিয়ে নাক সিটকায়। তার সন্তান দের উপড়ও এর প্রভাব নেমে আসে মারাত্মকভাবে। সমাজে ভালোমানুষের মুখোশ পড়ে যারা নানান অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হয়, তাদের মুখেই শোনা যায় ডিভোর্সি বা তাদের বিয়ে নিয়ে নানান কটুক্তি।
ভাঙাতে যেমন তাদের আপত্তি, তেমনি আপত্তি তাদের গড়া তেও।  ভাঙা পরিবারের মানুষগুলো যেন রক্ত মাংসে গড়া কোন বোবা প্রানী। সব মুখ বুজে সহ্য করা যেন এদের বাধ্যতামূলক। কোন প্রতিবাদের ভাষা এদের জানা নেই। যতদিন না আমরা ব্রোকেন ফ্যামিলির মানুষদের মানুষ বলে না মনে করবো ততদিন ই চলবে এই রীতি। ইচ্ছেমত মানসিক অত্যাচার চলবে এদের উপড় ততদিন যতদিন না আমাদের মনোভাবের পরিবর্তন না হচ্ছে। ডিভোর্স বা এই সংক্রান্ত ব্যাপারে আমাদের মধ্যযুগীয় চিন্তা ধারা পরিবর্তন না হচ্ছে ততদিন এই ভাঙাগড়ার হিসেবে গড়মিল থেকে যাবে।

blog comments powered by Disqus