মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার এক অনন্য নাম ডাঃএড্রিক বেকার

June 9, 2017, 4:54 a.m. তাঁর কথা


দীপংকর চৌধূরী : মানবতা ও অসামপ্রদায়িকতার এক অনন্য নাম ডাঃ এড্রিক বেকার। যার দেখানো পথেই আজো চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে মধুপুর গড় সহ আসে পাশের হাজারো মানুষ।

টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরগড়ে অবস্থিত ব্যতিক্রমী চিকিৎসাকেন্দ্র কাইলাকুড়ি সাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা এড্রিক বেকার গ্রামের সবার কাছেই যিনি ‘ডাক্তার ভাই’ হিসাবে পরিচিত। আর্তমানবতার সেবায় যারা জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পান এড্রিক বেকার তাদেরই একজন। মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। নিউজিল্যান্ডের তরুণ চিকিৎসক এড্রিক বেকার ৭১ সালে কাজ করছিলেন ভিয়েতনামের একটি মেডিকেল টিমে। তখন বাংলাদেশে চলছে মুক্তিযুদ্ধ। পত্র-পত্রিকায় বাংলাদেশের মানুষের উপর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বর্বরতা, ভারতগামী স্মরণার্থীদের ছবি নিয়মিত ছাপা হতো। এগুলো দেখে বাংলাদেশের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন ডাঃ এড্রিক বেকার। ডিসেম্বরে বিজয়ের খবর শুনে হন খুবই উল্লসিত। তখন থেকেই তার খুব ইচ্ছে একবার বাংলাদেশ ঘুরে যাবেন। আসলেনও ১৯৭৯ সালে। কিন্তু আর ফিরে যেতে পারলেন না। বাংলাদেশের টানে এদেশের মানুষের টানে আমৃত্যু রয়েগেলেন বাংলাদেশে।


এড্রিক বেকারের জন্ম ১৯৪১ সালে নিউজিল্যান্ডের রাজধানী ওয়েলিন্টনে। বাবা জন বেকার সরকারের পরিসংখ্যানবিদ। মা (ইঊঞঞণ) বেট্রি বেকার শিক্ষক। চারভাই দু’বোনের মধ্যে দ্বিতীয় এড্রিক ডুনিডেন শহরের ওটাগো মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৬৫ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ওয়েলিন্টনে ইন্টার্নি শেষে নিউজিল্যান্ড সরকারের সার্জিক্যাল টিমে যোগ দিয়ে চলে যান যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনামে। সেখানে কাজ করেন ৭৫ সাল পর্যন্ত। মাঝে অষ্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডে পোস্টগ্রাজুয়েশন কোর্স করেন ট্রপিক্যাল মেডিসিন, গাইনী, শিশু স্বাস্থ্য বিষয়ে। ৭৬ সালে পাপুয়া নিউগিনি ও জাম্বিয়ায় যান। কিন্তু কোথাও মন টেকেনা। এরই মধ্যে জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে চলে যান যুক্তরাজ্যে। এক বছর পর সুস্থ্য হয়ে ৭৯ সালে চলে এলেন বাংলাদেশে।

বাংলাদেশে এসে এড্রিক বেকার প্রথমে মেহেরপুর মিশন হাসপাতালে প্রায় দু’বছর ও পরে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে কুমুদিনী হাসপাতালে আটমাস কাজ করেন।  বড় কোন হাসপাতালে কাজ করার ইচ্ছে ছিলনা বেকারের। ইচ্ছে ছিল প্রত্যন্ত গ্রামে কাজ করার। অন্যরকম কিছু করার। সে চিন্তা থেকেই চলে আসেন  মধুপুর গড় এলাকায়।তখন সাধারণ মানুষের মাঝে কাজ করতে গিয়ে বুঝতে পারেন ভাষা শিক্ষা নেওয়া দরকার। তাই মধুপুরের জলছত্র খ্রীষ্টান মিশনে একবছর থেকে বাংলা ভাষা শিখে নেন তিনি। তারপর যোগ দেন গড় এলাকার থানারবাইদ গ্রামে। চার্চ অফ বাংলাদেশের একটি ক্লিনিকে। সেই থেকে প্রত্যন্ত পাহাড়ী এলাকায় অবস্থান করে মানুষের স্বাস্থ্য সেবা দিতে শুরু করেন ডাঃ বেকার।

৮৩ সালে দু’জন খন্ডকালীন এবং তিনজন সার্বক্ষণিক কর্মী নিয়ে বেকারের যাত্রা শুরু হয়। দিনদিন বাড়তে থাকে রোগীর সংখ্যা। তখন থানারবাইদের পাশের গ্রাম কাইলাকুড়িতে ১৯৯৬ সালে উপকেন্দ্র খুলে চিকিৎসা সেবা দেওয়া শুরু করেন।কাইলাকুড়িতে ২০০২ সালে কাইলাকুড়ি সাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্র নামে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের কাজ শুরু করেন। বর্তমানে সেখানে ৮৭ জন গ্রামীন যুবক-যুবতীকে প্রশিক্ষিত করে চলছে বেকারের স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম।মধুপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তরে প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় কাইলাকুড়ি গ্রামের অবস্থান। এলাকার আদিবাসী-বাঙালী প্রায় সবাই দরিদ্র। এরকম একটি প্রত্যন্ত এলাকায় চার একর জায়গার উপর ডাঃ বেকারের স্বাস্থ্য কেন্দ্র। ছোট ছোট মাটির ঘরে হাসপাতালের ডায়াবেটিস বিভাগ, যক্ষা বিভাগ, মা ও শিশু বিভাগসহ আলাদা আলাদা বিভিন্ন বিভাগে চল্লিশজন রোগী ভর্তির ব্যবস্থা রয়েছে।
সাধারনত বিভিন্ন মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের সাহায্যেই চলে বেকারের হাসপাতাল যার একটি বড় অংশ সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করেন নিউজিল্যান্ডে বসবাস কারি তার দুই বোন।

অসামপ্রদায়িক মতবাদে বিশ্বাসী বেকারের সাস্থ্য কেন্দ্রের দিন শুরু হয় সর্ব ধর্মের সমন্বয়ে ডাঃ বেকারের স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রতিদিন সকাল সাড়ে আটটায় আন্তঃধর্মীয় প্রার্থনার মধ্যদিয়ে শুরু হয় কার্যক্রম। এতে কেন্দ্রের সকল কর্মী, সকল রোগী, রোগীর আত্মীয়-স্বজনরা যোগদেন। গীতাপাঠ, কোরান তেলাওয়াত, বাইবেল পাঠ শেষে সবাই মিলে দেশাত্মবোধক, ভক্তিমূলক ও ধর্মীয় গান গায়। তারপর সবাই চলে যান যে যার কাজে। এর মধ্যদিয়ে ভেদাভেদ ঘুচে যায়। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায় বলে বেকার মনে করতেন।


২০১৪ সালের আগস্ট মাসে এড্রিক বেকারকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার।গত ১ সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
বেকার স্বপ্ন দেখতেন প্রতি বছর কয়েক হাজার ছেলে মেয়ে ডাক্তার হয়ে বের হচ্ছে। এদের মধ্যে অন্তত একজন একদিন চলে আসবেন তার হাসপাতালে। নিজেকে নিয়োজিত করবেন গ্রামের অসহায় দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্য সেবায় । সেরকম একজন মানুষের অপেক্ষায় সে চেয়ে ছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।

blog comments powered by Disqus